Aibrahim Riyadh's Blog

A Kite Without String...

July 8, 2019

ধর্ষণঃ পোশাক বা ধর্ষিতা নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা এবং মানসিকতা দায়ী।

©Photo: Imprint 
মানুষ তার নিজস্ব বিশ্বাসকে সবসময় সবচেয়ে উপরে রাখে, এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই জীবন ধারণ করে।আর এই বিশ্বাস তৈরি হয় সামাজিক পরিবেশ, পারিবারিক পরিবেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে।বিশ্বাস হচ্ছে এক ধরণের বীজ, যে যেরকম বিশ্বাস মস্তিষ্কে বপন করে ঠিক সেরকম উদ্ভিদ জন্মায়।একটা মানুষকে তার চিন্তাভাবনা অসাধারণ ব্যাক্তি করে তুলতে পারে, আবার তাকে ধব্বংস ও করে দিতে পারে।আস্তিক কিংবা নাস্তিক হোক সবাই বিশ্বাস করে।আপনার বিশ্বাস যখন আপনাকে অন্ধ বানিয়ে দেয়, আপনার ধর্মীয় নৈতিকতা, আপনার চিন্তাভাবনা যখন আপনাকে কথিত শেষ্ঠ জীব থেকে পশু বানিয়ে দেয় এই দায় কার?

বাংলাদেশে কতগুলো ধর্ষণ হয় সে হিসাব কষতে গেলে বাঙালি হিসেবে লজ্জা ছাড়া আর কিছুই নেই। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ধর্ষণ হলেই নারীর পোশাক এবং তার চরিত্র নিয়ে সমাজ কথা বলে।আর পুরুষকে দেবতা বানিয়ে পুজো করাটাই বাকি রাখে! একটা শিশু মেয়ে/ছেলে ধর্ষণের শিকার হয় কেন? ষাটোর্ধ বৃদ্ধা কেন ধর্ষিত হয়? অবলা প্রাণী ছাগল কেন ধর্ষণ হয়? ছোট বাচ্ছা ছেলে/মেয়ে,বৃদ্ধা, ছাগল/গরু এদেরও কি পর্দা করতে হবে?

শিশু(ছেলে মেয়ে উভয়) ধর্ষণ, কিশোর-কিশোরী ধর্ষণ,বিবাহিত নারী ধর্ষণ, সন্তানের জননী ধর্ষণ, বৃদ্ধা ধর্ষণ, পশুধর্ষণ এবং বৈবাহিক ধর্ষণ(স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনকর্ম করা।) এসব আমাদের দেশে বহুবছর ধরে চর্চা করা হচ্ছে।বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যের কল্যাণে আমরা কিছু সংবাদ দেখি।ধর্ষণের বেশিরভাগ সংবাদ থাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে।এমনকি ধর্ষণের ব্যপারটা মিটমাট করতে ধর্ষিতার সাথে ধর্ষকের বিয়েও দেয় সমাজ।অনেক বাচ্ছা শিশু, ছেলে/মেয়ে যৌন নির্যাতিত হয় তার নিজের পরিবারের মানুষ বা আত্মীয় স্বজনদ্বারা।অনেক নারী নিজের ইচ্ছে না থাকা সত্তেও স্বামীর চাহিদা পূরণে নিজেকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে তুলে দেয় স্বামীর হাতে।ধর্ষণের শিকার হওয়া মানুষগুলোর জৈবিক মৃত্যু হওয়ার আগেই তাদের ভেতরের মানুষটা মরে ভূত হয়ে যায়। বিভিন্ন সংস্থা শুধুমাত্র খবরেরকাগজ থেকে প্রাপ্ত ধর্ষণের সংবাদ হিসেব কষে সংখ্যা বলে দেয়।বাস্তবে কিন্তু প্রকাশিত এই সংখ্যার ১০গুণ বেশি ঘটনা ঘটে।সংবাদ মাধ্যমের তথ্যগুলোর দিকে তাকালে অবাক হতে হয়।গত ৬ মাসে ৪০০ এর অধিক ধর্ষণ হয়; এদের মধ্যে ৫০ জন শিশু, ১৬জন মারা যায়।২০১৮তেই শুধুমাত্র শিশু ধর্ষণ হয়েছিলো ৩৫৬টি, এদের মধ্যে ২২জন মারা যায়।

এই বঙ্গভূমি ধর্ষণভূমি হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা এবং মনোভাব।পুরুষ চায় না নারী কখনো সমাজে আধিপত্য বিস্তার করুক।তাই পুরুষ ধর্ম এবং রাজনীতির সুশৃঙ্খল শিকলে নারীকে বন্দী করে রেখেছে।নারী নিষিদ্ধ, নারী ভোগ্যপণ্য ও নারীর বুদ্ধি কম, তাই নারী পুরুষের দাসত্ব করবে।এই মনোভাব পোষণ করে শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমাজব্যবস্থা নির্মাণ করেছে পুরুষ।নারী স্বামীর চাহিদা মত নিজেকে বিলিয়ে না দিলে সে অসতী, পুরুষের যৌনচাহিদাকে প্রাধান্য দেয় এই সমাজ।ধর্মীয় বাণীও পুরুষকেই যৌনস্বাধীনতা দেয়।পাঠ্যবইয়েও দেখানো হয় নারীকে দূর্বল হিসেবে।এমনকি পরিবারেও লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হতে হয় নারীকে।পুরুষরাও এই মনোভাব নিয়েই বড় হয়ে উঠে।এই বিকৃত মস্তিষ্ক নিয়ে বেড়ে উঠা পুরুষরাই যৌনকামে উত্তেজিত হয়ে সামনে শিশু থাকুক, ছেলে থাকুক, বিবাহিত নারী কিংবা সন্তানের জননী ছাড়াও বৃদ্ধা এবং পশুকেও ছাড় দেয়না এইসব ছিদ্রান্বেষী পুরুষেরা।কেননা তাদের যৌনতা নিয়ে বিধিনিষেধ নেই।তারা সবসময়েই দূর্বলকে বাছাই করে যৌনকর্মে।

বর্তমানে ধর্ষণের পর হত্যা তুমুল ভাবে বেড়ে চলেছে।পূর্বে কেউ ধর্ষিত হলে থানা-পুলিশ পর্যন্ত যেতে দিতনা সমাজের বিচারকদের কারণে।বর্তমানেও তুলনামূলকভাবে থানায় যাওয়া বাড়লেও, এখনো সমাজের বিচারকগণ এটাকে মিমাংসা করে দিতে চায়।এমনকি থানায়ও মামলা না নিয়ে ধর্ষকের সাথে বিয়ে দিতে চায় ধর্ষিতাকে।এর মাঝেও কিছু সাহসী নারী আদালত পর্যন্ত হাজির হন।একজন ধর্ষক যখন কাউকে ধর্ষণ করেন তখন নিজের ক্ষতি হবার ভয়ে ধর্ষিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেন।এমনকি কোন ধর্ষিতা রক্ষা পেলে তাকে পুনরায় ধর্ষণ করা হয় ধর্ষণের পরিক্ষার নামে।তাকে সমাজ ধর্ষণ করে, রাষ্ট ধর্ষণ করে।এত বার ধর্ষিত হওয়ার পরেও যেসব নারী বেচে আছেন, তারা সত্যিকারের যোদ্ধা।তবে অনেকেই বারবার সমাজের কাছে, লোকের কাছে ধর্ষণ হবার ভয়ে নিজেকেই শেষ করে দেয়।আমাদের বঙ্গভূমিতে একটা ছেলে ও মেয়ে যৌনকর্ম করার পরে বন্ধুমহলে বলা হয় "মেয়েটাকে খেয়ে দিছি", এবং "ছেলেটা সেক্স করেছে"।শব্দচয়নের মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিকতা বিরাজমান। আমাদের সমাজে মেয়েদের পিরিয়ড এখনো ট্যাবু, মেয়েদের মাসিকের রক্তকে অপবিত্র বলা হয়।এই ব্যাপার নিয়ে পরিবারে আলোচনা হয়না।সমাজ যদি জানতে পারে তবে হাসিঠাট্টা শুরু।স্বামীর খুশিমতো স্ত্রীকে যৌনকর্মে অংশগ্রহণ করতে হবে, নাহলে ধর্মীয় দিক দিয়েও মেয়েটার পাপ হবে।

ধর্ষণ রোধ করতে হলে আমাদের চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস আগে পরিবর্তন করতে হবে।আমাদের বুঝতে হবে মেয়ে এবং ছেলে দু'জনের চাহিদা সমান।আমাদের পরিবার থেকে শিক্ষা দিতে হবে মেয়ে এবং ছেলের সব কিছুর অধিকার সমান৷কেউ কারো থেকে বড় নয়।সবার মতামতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।মেয়দের মাসিকের রক্ত নিষিদ্ধ নয়, মেয়েদের মতামতকেও সম্মান দিতে হবে।সব মানুষের মত প্রকাশ, সবাইকে সমাজ সমান দেখতে হবে।বিপরীত জনের সম্মতি ছাড়া যৌনকর্ম চুরি/ডাকাতির চোখে যদি সমাজ দেখে, পরিবার যদি মেয়ে এবং ছেলেদের সঠিক যৌনশিক্ষা প্রধান করে, পাঠ্যবইয়ে নারীদের ছোট না করে সবাইকে সমান দেখায়; তবে পরবর্তী প্রজন্মে ধর্ষক জন্মাবেনা।

আমি স্বপ্ন দেখি এমন সমাজের, যেখানে সব মানুষ সমান।সবাই সমান গুরুত্ব পাবে, সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে।নারীদের পিরিয়ডের রক্তকে পবিত্র ভাবা হবে।ছেলে এবং মেয়েদের ইচ্ছাকে পরিবার সম্মান দিবে।পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে বের হয়ে মানুষ সভ্য হবে।একটি ধর্ষণ ও হবেনা, বরং নারীত্বকে সম্মান করতে শিখবে।শারীরিক শক্তিশালী পুরুষকে সমাজ যেভাবে বাহবা দেয়, নারীর নিতম্ব ও স্তন দেখে অশ্লীল মন্তব্য না করে, তার কাজ নিয়েও বাহবা দিবে।জানি পরিবর্তন অনেক কঠিন, কিন্তু আগে আমাদের নিজেদেরকেই চেষ্টা করতে হবে।অন্ধবিশ্বাস ঝেড়ে না ফেললে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই সমাজব্যবস্থায় থেকে তারাও ধর্ষকে পরিনত হবে।আমাদের কাছের কেউই আবার ধর্ষিত হবে।ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য লড়াই করা এবং ধর্ষিত ব্যাক্তিকে কখনো দোষ না দিয়ে তার পাশে দাড়াতে পারলেই তবে আপনার নিজেকে মানুষ ভাববেন।
<a href="https://www.bloglovin.com/blog/20176393/?claim=h2pp7d67dca">Follow my blog with Bloglovin</a>

No comments:

Post a Comment